ইনডেক্স ইনভেস্টিং বনাম স্টকপিকিং হেজ ফান্ড

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিশ্লেষণাত্মক সতর্ক বিনিয়োগের প্রবণতা বেড়েছে

বিগত এক দশকে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ প্রবণতায় বাজারভিত্তিক সূচকনির্ভরতাই (ইনডেক্স ইনভেস্টিং) প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।

বিগত এক দশকে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ প্রবণতায় বাজারভিত্তিক সূচকনির্ভরতাই (ইনডেক্স ইনভেস্টিং) প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। বাজারের বিভিন্ন সূচকের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের জন্য গঠিত তহবিলগুলোয় অর্থ ঢেলেছেন বিনিয়োগকারীরা। এর বিপরীতে সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদান, কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আর্থিক ও ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এর ভিত্তিতে বাছাইকৃত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের (স্টকপিকিং) জন্য গঠিত তহবিলগুলোয় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমেই কমছে। গত এক দশকে স্টকপিকিং হেজ ফান্ডগুলোয় বিনিয়োগের পরিবর্তে সেখান থেকে অর্থ তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বেশি। তবে এ প্রবণতাকে উল্টে দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান অস্থিতিশীলতা ও বাজার অস্থিরতা। আবারো বিনিয়োগ ফিরতে শুরু করেছে স্টকপিকিং হেজ ফান্ডগুলোয়।

গবেষণা সংস্থা হেজ ফান্ড রিসার্চের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত স্টকপিকিং হেজ ফান্ডগুলো থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়েছে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) এসব ফান্ড গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইনডেক্স ইনভেস্টিংয়ে দ্রুত বিনিয়োগ ও মুনাফার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও ঝুঁকি অনেক। বিশেষ করে যেকোনো সময় বাজারে ধস নেমে সূচকের বড় পতন হলে বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার বাজারভিত্তিক সূচকগুলোয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানির পারফরম্যান্সের বিপরীতে শেয়ারদরে অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নের আশঙ্কাও রয়েছে। শেয়ারবাজারে সাময়িক সময়ের জন্য ভালো পারফরম্যান্স দেখানো কোম্পানিগুলো কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে নানা ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। সে তুলনায় স্টকপিকিংয়ের প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীরগতির হলেও এটি তুলনামূলক বেশি নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। ওয়ারেন বাফেটের মতো বিনিয়োগকারীরা অতীতে এমন সতর্ক বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারে দীর্ঘমেয়াদে ও স্থিতিশীল মুনাফা তুলে নেয়ার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হেজ ফান্ড ম্যানেজারদের মধ্যে বাজার নিয়ে সময়সাধ্য গবেষণার পরিবর্তে সূচকের গতি অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগের প্রবণতা দেখা গেছে বেশি।

তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি বিনিয়োগকারীদের এখন দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারেও দেখা যাচ্ছে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের পরিবর্তে সতর্ক বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফার নিশ্চয়তা পেতে চাচ্ছেন আর্থিক খাতের বিনিয়োগকারীরা। স্টকপিকিংয়ের মাধ্যমে হেজ ফান্ড খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ক্রিস হনের টিসিআই ও জন আর্মিটেজের এগারটন গত জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বিনিয়োগকারীদের দুই অংকের রিটার্ন নিশ্চিত করেছে।

ইন্ডাস ক্যাপিটালের অংশীদার ও ক্লায়েন্ট অ্যাডভাইজরি বিভাগের প্রধান জ্লাটা গ্লিসনের ভাষ্যমতে, ‘বাজারে স্টকপিকার বা বাছাইকৃত বিনিয়োগের সময় আবার ফিরে এসেছে। বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অনেকটা রোলার কোস্টারের মতো। ঠিক এ কারণে স্টকপিকারদের লাভবান হওয়ার সময় এখনই।’

এর আগে গত নয় বছরে স্টকপিকিং হেজ ফান্ডগুলো থেকে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাজারের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এসব ফান্ড থেকে তারা প্রত্যাশামাফিক সুরক্ষা পাননি। যদিও বিনিয়োগ পরিষেবার বিনিময়ে এসব তহবিল ম্যানেজাররা গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশ মোটা অংকের অর্থ ফি হিসেবে নিয়েছে।

কিন্তু চলতি বছরের বাজার অস্থিরতা স্টকপিকিং হেজ ফান্ডের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর শেয়ারবাজারের দ্রুত পতন ও পরে ঘুরে দাঁড়ানো এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে।

এ বিষয়ে হেজ ফান্ড ভ্যালু ওয়ার্কসের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস লেমোনাইডেস বলেন, ‘লিবারেশন ডে অনেকের জন্য একটা সতর্কবার্তা ছিল। সে মুহূর্তে চারপাশের অস্থিরতা সবার মনোযোগ কেড়েছে। বাজারে এমন পরিস্থিতিতে শুধু সূচকভিত্তিক বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয়াটা নিরাপদ নয়।’

টিসিআই, এগারটন ও কিন্টবুরি ক্যাপিটালের মতো লন্ডনভিত্তিক হেজ ফান্ডগুলো সম্প্রতি ২০ শতাংশ বা তার বেশি রিটার্ন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে লি আইন্সলির মাভেরিক ও ড্যানিয়েল সানডহেইমের ডি১ ক্যাপিটাল পার্টনার্সের যথাক্রমে ১৪ ও ২০ শতাংশের বেশি রিটার্ন দিয়েছে। মালা গাঁওকার পরিচালিত হেজ ফান্ড সার্জোক্যাপ পার্টনার্স ১৭ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে। আগের বছর দিয়েছিল ৩৩ শতাংশ রিটার্ন। ২০২৩ সালে ১৮০ কোটি ডলার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু প্রতিষ্ঠানটি এখন ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পরিচালনা করছে।

কিছু স্টকপিকার বলছেন, তারা উচ্চ সুদহারের সুবিধা পেতে শুরু করেছেন। ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক সংকটের পর প্রায় এক দশকজুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদার মুদ্রানীতি ও ঋণের স্বল্পব্যয় বাজারকে একসঙ্গে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে আলাদা করে কোনো শেয়ারের পতনের ওপর বাজি ধরা (শর্ট সেলিং) কঠিন হয়ে উঠেছিল।

এখন বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আয় নিয়ে বেশি বিচার বিশ্লেষণ করছেন বলে জানান লন্ডনভিত্তিক এক হেজ ফান্ড ম্যানেজার। তিনি বলেন, ‘যেসব কোম্পানি প্রত্যাশিত আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না, বাজার তাদের প্রতি ভীষণ রূঢ় আচরণ করছে। তাই এটি স্টকপিকিং হেজ ফান্ডের জন্য দারুণ একটি পরিবেশ।’

গত কয়েক বছর বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের সূচক নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এখন সে পরিস্থিতি বদলেছে। ইকুইটি রিটার্ন এখন তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ভিত্তির ওপর নির্ভর করছে।

ট্রাম্পের শুল্ক বিবাদ শুরুর পর অনেক ইউরোপীয় সূচক এবারই প্রথম বাজারে এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। পাশাপাশি জার্মানির রাইনমেটাল ও যুক্তরাজ্যের বিএইর মতো প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর আবার চাঙ্গা হয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক এক হেজ ফান্ড নির্বাহী বলেন, ‘এখন আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় তিন-চারটি কোম্পানি সূচকের রিটার্ন নিয়ন্ত্রণ করছে না। বর্তমানে বাজার অনেকটাই স্টকপিকারদের অনুকূলে।’

আরও